Monday, August 15, 2016

বাংলা ট্রিবিউনকে ক্যাডারবঞ্চিত ফোরামের সমন্বয়কমন্ত্রিত্ব চাইনি, বিসিএসে পাস করেছি চাকরি চাই

নূর ইসলাম নূর, ৩৪তম বিসিএস ক্যাডারবঞ্চিত ফোরামের সমন্বয়ক। ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার ফলাফলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অস্বচ্ছতার প্রমাণ মিলেছে দাবি করে তিনিসহ প্রায় ৫ হাজার পরীক্ষার্থী মাঠে নেমেছেন। তাদের দাবি, মেধাবী হয়েও তারা দুর্নীতির কারণে ক্যাডার হতে পারেননি। তিনি বলেছেন, ‘আমরা মন্ত্রিত্ব চাইনি, বিসিএস পরীক্ষায় পাস করেছি চাকরি চাই।’ ৩৪তম বিসিএসের ফল পুনর্মূল্যায়ন, এই বিসিএসের ৬৭২টি শূন্যপদ ৩৫তম বিসিএস থেকে পূরণ না করে ৩৪তম থেকে পূরণ ও নন-ক্যাডারে উত্তীর্ণ সব প্রার্থীর চাকরির নিশ্চয়তার দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘ ৬ মাস ধরে।
বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করে বলেছেন, ‘আমরা সরকারের বিরুদ্ধে না, পিএসসির দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বোঝানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সঠিক তদন্ত করে যদি দেখেন আমরা মিথ্যা অভিযোগ করছি, তাহলে মাথা নিচু করে সরে দাঁড়াবো’। তার সঙ্গে কথা শুরু হয় আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে।
বাংলা ট্রিবিউন: আন্দোলনে নেমেছেন কেন?
নূর ইসলাম নূর: ৩৪তম বিসিএসে প্রচুর দুর্নীতি করেছে পিএসসি। আমরা এ পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে এগিয়ে থাকলেও আমাদেরকে কৌশলে বঞ্চিত করা হয়েছে। ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই দুর্নীতির প্রমাণ হাতে আসতে শুরু করে। পরে এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: কী ধরণের দুর্নীতি হয়েছে বলে দাবি করেন?
নূর ইসলাম নূর: আমার কাছে অনেক যুক্তি এবং প্রমাণ রয়েছে। প্রথমত, ক্যাডারদের ফলাফল মেধাক্রম অনুসারে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নন-ক্যাডারদের মেধাক্রম অনুসারে দেওয়া হয়নি। ৩৪তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপনে ৩৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নন-ক্যাডারদের মেধাক্রম অনুসারে নিয়োগ দেওয়া হবে। অথচ মেধাক্রম অনুসারে ফল প্রকাশ করা হয়নি। নন-ক্যাডার নিয়োগ পুরোপুরি অস্বচ্ছ। ৩৪তম বিসিএসে মেধা ও প্রাধিকার কোটা আলাদাভাবে ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি, যা ২৭ থেকে ৩৩তম বিসিএসে করা হয়েছে। কমিশন প্রথম দশ জনের মেধা তালিকা প্রকাশ করতো বিগত বিসিএসগুলোতে। এবার তা করেনি।
দ্বিতীয়ত, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, দ্রুততার জন্য মেধা ও প্রাধিকার কোটা আলাদা করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ৩৩তম বিসিএসে ১৮ হাজার প্রার্থীর ভাইভা নিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয় ৬৬তম দিনে অথচ ৩৪তম বিসিএসে মাত্র ১০ হাজার প্রার্থীর ভাইভা নিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয় ৮৯তম দিনে। অন্য এক গণমাধ্যমে তিনি বলেছেন, মেধা ও প্রাধিকার কোটা আলাদা করলে কোটাধারীরা বিব্রত বোধ করেন। অথচ কোটাধারীরা আদালতে রিট করেছেন মেধা ও প্রাধিকার কোটা আলাদা করে ফল প্রকাশের জন্য।
তৃতীয়ত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধীদের প্রতি যতটা সহনশীল বাংলাদশে কর্ম কমিশন ততটাই অসহনশীল। কারণ প্রতিবন্ধী কোটা ১ শতাংশ, কমিশন ২১৫৯ জনকে সুপারিশ করেছেন, যেখানে প্রতিবন্ধী থাকার কথা ২১ জন। কিন্তু মাত্র তিনজনকে সুপারিশ করে বাকি প্রতিবন্ধীদের নন ক্যাডারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 চতুর্থত, এই বিসিএসে ৪০৪টি পদ শূণ্য রাখা হয়েছে। কমিশন বলেছে, এটা নাকি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সংরক্ষিত পদ। অথচ ৩১ ও ৩৩তম বিসিএসে কোটার পদ মেধা থেকে পূরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদেরকেও কৌশলে বাঞ্চিত করা হয়েছে। বঞ্চিতরা প্রধানমন্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, পিএসসির চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপি দিয়েও কোনও সাড়া শব্দ পায়নি; তাদের হাহাকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা তাদের বাবাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য সারাদিন প্রখর রোদের মধ্যে গেটে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনও লাভ হয়নি।
পঞ্চম, প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ আছে, গণিতে শূণ্য পদের সংখ্যা ৪৭। ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণের নিয়ম রয়েছে। ৩০ শতাংশ = ১৪ জন। যদি এখানে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় একজনকেও খুঁজে না পাওয়া যায় তবে বাকি ৭০ শতাংশ = ৩৩ জনকে কমিশনের সুপারিশ করার কথা, অথচ হাস্যকর সংবাদ হলো- কমিশন এখানে সুপারিশ করেছে মাত্র ২৫ জনকে। বাকি ৮টি পদ কার জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে? অন্যদিকে টেকনিক্যাল ক্যাডারে স্বাস্থ্য সহকারী পদে ৭৪টি পদ খালি রাখা হয়েছে। বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৬১টি পদের মধ্যে ৫০৭ টি পদ শূণ্য। সারা দেশের তথ্য তো আরও ভয়াবহ। স্বাস্থ্য ক্যাডারে পদ শূণ্য রাখার জন্য স্বাস্থমন্ত্রীও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
ষষ্ঠত, ৩৪তম বিসিএস ফলাফল প্রকাশ পায় প্রজ্ঞাপনের প্রায় ৩ বছরের মাথায়। প্রশাসন ক্যাডারে শূণ্য পদ ছিল ২০০ কিন্তু সুপারিশ করা হয়েছে ২৯৩ জনকে। ৩ বছরে ৯৩টি পদ খালি হতেই পারে। কিন্তু টেকনিক্যাল বা প্রফেশনাল ক্যাডারে একটা পদ ও বাড়েনি। উল্টো খালি রাখা হয়েছে। এ থেকে মোটামুটি বলা যায়, ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ। ৩৪তম বিসিএসে আরও একটা রেকর্ড তৈরি হয়েছে, ফলাফল প্রকাশ করা হয় ছুটির দিন রাত ১০টায়। ইতোপূর্বে আর কোনও বিসিএসের ফলাফল ছুটির দিনে প্রকাশ হয়নি। এক্ষেত্রে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, “ছুটির দিনে রাতের আঁধারে তাদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে পিএসসি এবং তাদের বঞ্চিত করেছে”।
 বাংলা ট্রিবিউন: জেনেছি আপনারা হাইকোর্টে রিট করেছেন?

নূর ইসলাম নূর:
এ পর্যন্ত হাইকোর্টে প্রায় ১২ থেকে ১৩টি বিভিন্ন গ্রাউন্ডে রিট করেছেন আন্দোলনকারীরা। ২৮ থেকে ৩৩তম বিসিএস পর্যন্ত কোনও রিট হয়নি, এ ধরনের আন্দোলনও হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে ৩৪তম বিসিএসে এত রিট বা আন্দোলন কেন? কিন্তু এ বিষয়ে কেউ ক্ষতিয়ে দেখছেন না। কারণ সব দুর্নীতি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে রয়েছে। এছাড়া ৩৪তম বিসিএসের দুর্নীতির সংবাদ গণমাধ্যমে যেভাবে প্রকাশ হয়েছে তা তদন্ত করলে এটার ভেতরের খবর সব বের হয়ে আসবে। তাই সরকার চায় না এটা তদন্ত করতে। সব ফাঁস হয়ে গেলে সরকারের জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবে।

বাংলা ট্রিবিউন: আন্দোলনরত অনেকেকেই পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। কোনও রকম নির্যাতন করেছে কি?

নূর ইসলাম নূর:
কোনও নির্যাতন করেনি। তবে আমাদের শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতেও দেয়নি। দেড় মাস ধরে আন্দোলন করছি অথচ রাস্তায় গাড়ি আটকাইনি, ভাংচুর হয়নি। আমাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ। শরীরের রক্ত রাস্তায় ঢেলেছি। শরীরে ও অরিজিনাল সার্টিফিকেটে আগুনও দিয়েছি। বর্তমানে আমি খুবই অসুস্থ। আমাদের আন্দোলনকারী অনেকেই অসুস্থ। আন্দোলনে বারবার বলেছি, আমাদের কাছে দুর্নীতির প্রমাণ আছে। একটু আমাদের কথা শোনেন, তারপরও কারও কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। সবাই যেন দুর্নীতেকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে। এভাবে মেধাবীদের বঞ্চিত করলে, রিজিকের ওপর আঘাত হানলে, হয়তো এরাই একদিন বিপ্লবী হয়ে উঠবে, তখন বিদ্রোহের আগুন নেভানোর মত পর্যাপ্ত রসদ পাওয়া যাবে না। শিক্ষামন্ত্রীকে প্রায় বলতে শুনি, মেধাবীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেবে সরকার। কিন্তু কই? আমরা দেখছি মেধাবীরাই সব চেয়ে অবহেলিত। মেধাবীদের বঞ্চিত করে ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা কি আদৌ গড়া সম্ভব?
বাংলা ট্রিবিউন: সামনে কোনও কর্মসূচি দেবেন কি?
নূর ইসলাম নূর: অবশ্যই, আমরা এখনও আন্দোলনের মধ্যে আছি। বিসিএস নামক সোনার হরিণের পেছনে তিন বছর পার করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করার পরেও প্রার্থীরা বলেন, তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীর চাকরি দিলেও খুশি। কারণ একটাই, তার চাকরির বয়স শেষ। আমরা তো এখন রিকশা চালাতেও পারবো না। হতাশা ও হাহাকার দেখে চোঁখের পানি ধরে রাখতে পারি না। অথচ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রায় ৫০ হাজার পদ খালি, কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এখনও চুপ। অবিচার ও বঞ্চিত করার জন্য আমাদের মধ্যে যে হতাশা বিরাজ করছে, কেউ যদি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় তবে তার দায়ভার কি পিএসসি নেবে?

Sunday, August 14, 2016

বিসিএসে উত্তীর্ণ, তবু চাকরি হয়নি নন–ক্যাডারে

স্বপ্নের ক্যাডার পদের আশায় বিসিএস পরীক্ষা দেন তরুণেরা। কিন্তু পদস্বল্পতার কারণে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েও বেশির ভাগেরই নন-ক্যাডার পদেও চাকরি মেলে না। ২৮ থেকে ৩৩তম বিসিএসে উত্তীর্ণ এমন প্রায় ১৯ হাজার প্রার্থী প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার কোনো পদেই চাকরি পাননি। বঞ্চিত প্রার্থীরা বলছেন, দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়েও চাকরি না পাওয়া খুব কষ্টের। এই সমস্যার সমাধান জরুরি।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৮ থেকে ৩৩তম বিসিএস পরীক্ষায় ৩৯ হাজার ৪১৯ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৫৬০ জনকে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি। বাকি ২০ হাজার ৮৫৯ জন প্রার্থীকে নন-ক্যাডারের জন্য রাখা হয়। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ১৮ হাজার ৯০৬ জনই চাকরি পাননি। এ নিয়ে তাঁরা বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করলেও অবস্থা বদলায়নি।
পিএসসি বলেছে, বারবার তাগাদা দিলেও মন্ত্রণালয়গুলো চাহিদা না দেওয়ায় অতীতে এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থী চাকরি পাননি। তবে এবার ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ প্রায় ৬ হাজার ৫৮৪ প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ২ হাজার ৫০০ জন নন-ক্যাডার পদে চাকরি পাবেন। এর মধ্যে গত সোমবার করপরিদর্শকের ৩১৯টিসহ ৩৩৮টি পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ৫০০ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের
প্রধান শিক্ষক পদে ১ হাজার ১০০ জনের নিয়োগ হবে। এর আগে নিয়োগ পেয়েছেন ১৫৯ জন। পিএসসি বলছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রধান শিক্ষক পদে ১ হাজার ৬০০ জনের এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ৯০০ জনের চাহিদা থাকলেও এ মুহূর্তে মোট ১ হাজার ৬০০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। বাকি পদগুলো মুক্তিযোদ্ধা কোটার জন্য সংরক্ষিত থাকছে।
জানতে চাইলে পিএসসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, একটা বিসিএস পরীক্ষায় দুই লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় হাজার জন চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হন। কিন্তু ক্যাডার পদের স্বল্পতার কারণে সবাইকে নিয়োগ করা যায় না। এ জন্যই নন-ক্যাডারের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নিয়োগ বিধিমালা করা হয়েছিল। কিন্তু তাতেও দেখা গেছে, একটা বড় অংশই অতীতে চাকরি পায়নি। এটা দুঃখজনক। তবে ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ ব্যক্তিদের একটা বড় অংশ নন-ক্যাডারে চাকরি পাবে। এ পর্যন্ত ছয়টি বিসিএসে যা হয়েছে শুধু ৩৪তম বিসিএস থেকে তার চেয়ে বেশি নিয়োগ হচ্ছে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটার জন্য সংরক্ষিত রাখতে না হলে দ্বিতীয় শ্রেণির পদে আবেদনকারীদের সবাই চাকরি পেতেন।
বিসিএসের মাধ্যমে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২৮তম বিসিএস থেকে। ওই বিসিএসে ৫ হাজার ১০৫ জন উত্তীর্ণ হন। এর মধ্যে ২ হাজার ১৯০ জনকে ক্যাডারে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। বাকি ২ হাজার ৯১৫ জন নন-ক্যাডারের যোগ্য ছিলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মাত্র ২৯৯ জন চাকরি পান।
একইভাবে ২৯তম বিসিএসে ৩ হাজার ৩৪০ জনের মধ্যে মাত্র ১৯৩ জন, ৩০তম বিসিএসের ২ হাজার ৮১৩ জনের মধ্যে ৩৬৩, ৩১তম বিসিএসের ৩ হাজার ৪১৭ জনের মধ্যে ১২০ এবং ৩২তম বিসিএসের ১ হাজার ৯১২ জনের মধ্যে মাত্র ৬৬ জন নন-ক্যাডারের প্রথম শ্রেণির পদে নিয়োগ পান। ৩৩তম বিসিএসের ৭ হাজার ৪৬২ জনের মধ্যে ৩৪৪ জন প্রথম শ্রেণির এবং ৫৬৮ জন দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগ পান। সব মিলিয়ে চাকরি পান মাত্র ১ হাজার ৯৫২ জন। অর্থাৎ এই ছয়টি বিসিএসের নন-ক্যাডারের জন্য রাখা প্রার্থীদের ৯০ শতাংশই চাকরি পায়নি। অবশ্য বিসিএস উত্তীর্ণ কিছু প্রার্থী নন-ক্যাডার পদে যোগ দিতে আগ্রহী না হয়ে বয়স থাকা পর্যন্ত বিসিএস পরীক্ষা দেন।
মন্ত্রণালয়গুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নন-ক্যাডার প্রথম শ্রেণির ৩৯ হাজার ৫৬৪টি এবং দ্বিতীয় শ্রেণির ৩০ হাজার ৪২২টি পদ শূন্য রয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয়গুলো পিএসসিতে চাহিদা না পাঠানোয় বিসিএস-উত্তীর্ণ বিপুলসংখ্যক প্রার্থী নিয়োগ পাননি।
প্রার্থীদের হতাশা: ৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ জিবরান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি বিসিএসের পেছনে চার বছর সময় দিলাম। উত্তীর্ণ হলাম। শেষ পর্যন্ত চাকরি না পেলে এর চেয়ে কষ্টের আর কী থাকে। অতীতে দেখেছি, নন-ক্যাডারের অনেকেরই বয়স চলে গেছে, চাকরি মেলেনি।’
একই রকম কথা বললেন মানিক মোহাম্মদ, হুমায়ুন মোরশেদ ও জহিরুল ইসলাম। সিফাত আরা হোসেন ও জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, পিএসসির বর্তমান চেয়ারম্যান ৩৪তম বিসিএস থেকে বিপুলসংখ্যক প্রার্থীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডারে নিয়োগ দিচ্ছেন। তাঁর কাছে অনুরোধ, তিনি যেন বাকিদেরও চাকরি দেন। পিএসসি ও সরকার মিলে চাইলেই বিসিএসে উত্তীর্ণ সবার চাকরি হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, উপজেলা আনসার কর্মকর্তা, খাদ্যপরিদর্শকসহ আরও অনেক পদের চাহিদা ছিল। সেগুলোতে কেন নিয়োগ দিচ্ছে না পিএসসি?
মেহেদি হাসান, আল মাসুম, কানিজ ফাতেমা, অসীম কুমারসহ ২৫-৩০ জন উত্তীর্ণ প্রার্থী বলেন, বিসিএস দিতে দিতে অনেকেরই বয়স শেষ হয়ে যায়। অন্যদিকে সরকারের ৪০-৫০ হাজার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদ শূন্য থাকে। সরকার চাইলে বিসিএসে উত্তীর্ণ সবাইকে নিয়োগ দিতে পারে।
২০১০ সালের ১০ মে প্রজ্ঞাপন করে নন-ক্যাডার বিধিমালা-২০১০ জারি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, শূন্য পদের ৫০ শতাংশ বিসিএসে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের দিয়ে পূরণ করা হবে। পরবর্তী বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত আগের বিসিএস থেকে নিয়োগ চলবে। ২০১৪ সালে এই বিধি সংশোধন করে প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদের পাশাপাশি দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা পদেও নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়। কিন্তু এরপরও চাকরি পাচ্ছেন না সবাই।
পিএসসির সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এত কষ্ট করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি না পাওয়া দুঃখজনক। মন্ত্রণালয়গুলোর ৫০ শতাংশ পদে বিসিএস উত্তীর্ণদের নিয়োগ দেওয়ার বিধি করা হলেও মন্ত্রণালয়গুলো চাহিদা দিতে আগ্রহী থাকে না। ফলে অধিকাংশই নিয়োগ পান না।’
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা বিসিএস উত্তীর্ণ হন তাঁরা অবশ্যই মেধাবী। আর মন্ত্রণালয়গুলোরও তো লোক দরকার। এত পদ শূন্য থাকার পরও পিএসসিতে তারা চাহিদাপত্র দেয় না বলে অধিকাংশ নিয়োগ-বঞ্চিত থাকেন। এটি অনুচিত।’

http://goo.gl/iKHu8K

পদ খালি থাকলেও বঞ্চিত হচ্ছেন ৭১৬ প্রার্থী


পদ আছে, প্রার্থীও আছে; তার পরও ৩৪তম বিসিএসের দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে সুপারিশবঞ্চিত হচ্ছে ৭১৬ জন। সাড়ে তিন বছর ধরে চলছে ৩৪তম বিসিএসের নিয়োগের প্রক্রিয়া। শিগগির প্রকাশিত হবে ৩৫তম বিসিএসের ফল। তার আগেই সুপারিশ করা না হলে এই প্রার্থীরা চাকরি পাবেন না।
সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কর্মকর্তাদের অবহেলা ও কোটা পদ্ধতির কারণে নিয়োগ পাচ্ছেন না প্রার্থীরা। এই ৭১৬ জনের বেশির ভাগের সরকারি চাকরির বয়স শেষ হয়ে গেছে। তাঁরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
৩৪তম বিসিএসে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন মোট আট হাজার ৭৬৩ জন প্রার্থী। দুই হাজার ১৫৯ জনকে বিভিন্ন ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি। এরপর প্রথম শ্রেণির নন-ক্যাডার পদের জন্য আবেদন করেন পাঁচ হাজার ১৭০ জন প্রার্থী। তাঁদের মধ্য থেকে ৪০৭ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। এরপর দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদের জন্য আবেদন করেন দুই হাজার ৫৬৩ জন। তাঁদের মধ্য থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগের জন্য ৮৯৮ জনকে, কর কমিশনে ৩৪০ জনকে, সমাজকল্যাণ, শ্রম মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আরো ১৪৯ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। মোট এক হাজার ৩৮৭ জন দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগের সুপারিশ পেয়েছেন। আরো ৪৬০ জনকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুপারিশ করা হবে বলে পিএসসি সূত্র জানায়। এর পরও ৭১৬ জন প্রার্থীর সুপারিশ বঞ্চিত রয়ে গেছে।
সূত্র জানায়, প্রাথমিকের প্রধান শিক্ষকের তিন হাজার পাঁচটি পদের চাহিদার কথা জানায় প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। কোটা বাদ দিয়ে ৩৪তম বিসিএস থেকে এক হাজার ৩৫০ জনের চাকরি হওয়ার কথা। কিন্তু নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে ৮৯৮ জনকে। ৪৫২ জন সুপারিশবঞ্চিত হয়েছে। সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার ১৩৫টি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাইফার কর্মকর্তার ৫৪টি শূন্যপদের তালিকাও জমা আছে পিএসসিতে। বিধি অনুযায়ী ৩৪তম বিসিএস থেকেই এসব পদ পূরণ করার কথা। পিএসসি সুপারিশ করলেই উপর্যুক্ত ৬৪১ পদে নিয়োগ সম্পন্ন করা যায়।
৩৪তম বিসিএসের দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদের জন্য আবেদনকারী উজ্জ্বল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায়। মেধা তালিকায় এ উপজেলার সবার আগে আমার স্থান। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে আমার উপজেলায় দুটি পদ খালি ছিল। একটি মহিলা কোটার, অন্যটি পোষ্য কোটার। মহিলা কোটায় প্রার্থী পাওয়া গেলেও পোষ্য কোটায় পাওয়া যায়নি। আমি মেধা তালিকায় সবার আগে থাকলেও আমাকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়নি।’
কামরুজ্জামান নামের এক প্রার্থী বলেন, ‘নিয়ম আছে ৩৫তম বিসিএসের ফল প্রকাশের আগ পর্যন্ত যত নিয়োগের চাহিদার কথা জানানো হবে সব ৩৪তম বিসিএস থেকেই পূরণ করতে হবে। কিন্তু পদ খালি থাকার পরও আমাদের নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে না। সেটা করা হলে দ্বিতীয় শ্রেণির পদের জন্য আবেদনকারী প্রায় সবার চাকরি হওয়া সম্ভব।’
আল মামুন নামের এক প্রার্থী বলেন, ‘প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে ঘুরছি। যেহেতু দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডারে পদ আছে, প্রার্থীও কম, তাই আশা নিয়ে বসেছিলাম। বেসরকারি চাকরিও খুঁজিনি। পরিবারের কাছে এখন কী জবাব দেব?’
এসব বিষয়ে পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৩৪তম বিসিএস থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ৪৫০ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগই হবে শেষ নিয়োগ। আমাদের কাছে চাহিদা এলে সেগুলো যাচাই-বাছাই করতে হয়। বিধি পর্যালোচনা করতে হয়। তাই এই বিসিএস থেকে আর নিয়োগের সুপারিশ করা সম্ভব নয়।’







http://www.kalerkantho.com/print-edition/news/2016/08/14/393155