Monday, August 15, 2016

বাংলা ট্রিবিউনকে ক্যাডারবঞ্চিত ফোরামের সমন্বয়কমন্ত্রিত্ব চাইনি, বিসিএসে পাস করেছি চাকরি চাই

নূর ইসলাম নূর, ৩৪তম বিসিএস ক্যাডারবঞ্চিত ফোরামের সমন্বয়ক। ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার ফলাফলে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং অস্বচ্ছতার প্রমাণ মিলেছে দাবি করে তিনিসহ প্রায় ৫ হাজার পরীক্ষার্থী মাঠে নেমেছেন। তাদের দাবি, মেধাবী হয়েও তারা দুর্নীতির কারণে ক্যাডার হতে পারেননি। তিনি বলেছেন, ‘আমরা মন্ত্রিত্ব চাইনি, বিসিএস পরীক্ষায় পাস করেছি চাকরি চাই।’ ৩৪তম বিসিএসের ফল পুনর্মূল্যায়ন, এই বিসিএসের ৬৭২টি শূন্যপদ ৩৫তম বিসিএস থেকে পূরণ না করে ৩৪তম থেকে পূরণ ও নন-ক্যাডারে উত্তীর্ণ সব প্রার্থীর চাকরির নিশ্চয়তার দাবি জানিয়ে আসছেন দীর্ঘ ৬ মাস ধরে।
বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি যুক্তি ও প্রমাণ উপস্থাপন করে বলেছেন, ‘আমরা সরকারের বিরুদ্ধে না, পিএসসির দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি। প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বোঝানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সঠিক তদন্ত করে যদি দেখেন আমরা মিথ্যা অভিযোগ করছি, তাহলে মাথা নিচু করে সরে দাঁড়াবো’। তার সঙ্গে কথা শুরু হয় আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে।
বাংলা ট্রিবিউন: আন্দোলনে নেমেছেন কেন?
নূর ইসলাম নূর: ৩৪তম বিসিএসে প্রচুর দুর্নীতি করেছে পিএসসি। আমরা এ পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে এগিয়ে থাকলেও আমাদেরকে কৌশলে বঞ্চিত করা হয়েছে। ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই দুর্নীতির প্রমাণ হাতে আসতে শুরু করে। পরে এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: কী ধরণের দুর্নীতি হয়েছে বলে দাবি করেন?
নূর ইসলাম নূর: আমার কাছে অনেক যুক্তি এবং প্রমাণ রয়েছে। প্রথমত, ক্যাডারদের ফলাফল মেধাক্রম অনুসারে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নন-ক্যাডারদের মেধাক্রম অনুসারে দেওয়া হয়নি। ৩৪তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপনে ৩৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নন-ক্যাডারদের মেধাক্রম অনুসারে নিয়োগ দেওয়া হবে। অথচ মেধাক্রম অনুসারে ফল প্রকাশ করা হয়নি। নন-ক্যাডার নিয়োগ পুরোপুরি অস্বচ্ছ। ৩৪তম বিসিএসে মেধা ও প্রাধিকার কোটা আলাদাভাবে ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি, যা ২৭ থেকে ৩৩তম বিসিএসে করা হয়েছে। কমিশন প্রথম দশ জনের মেধা তালিকা প্রকাশ করতো বিগত বিসিএসগুলোতে। এবার তা করেনি।
দ্বিতীয়ত, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, দ্রুততার জন্য মেধা ও প্রাধিকার কোটা আলাদা করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ৩৩তম বিসিএসে ১৮ হাজার প্রার্থীর ভাইভা নিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয় ৬৬তম দিনে অথচ ৩৪তম বিসিএসে মাত্র ১০ হাজার প্রার্থীর ভাইভা নিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা হয় ৮৯তম দিনে। অন্য এক গণমাধ্যমে তিনি বলেছেন, মেধা ও প্রাধিকার কোটা আলাদা করলে কোটাধারীরা বিব্রত বোধ করেন। অথচ কোটাধারীরা আদালতে রিট করেছেন মেধা ও প্রাধিকার কোটা আলাদা করে ফল প্রকাশের জন্য।
তৃতীয়ত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধীদের প্রতি যতটা সহনশীল বাংলাদশে কর্ম কমিশন ততটাই অসহনশীল। কারণ প্রতিবন্ধী কোটা ১ শতাংশ, কমিশন ২১৫৯ জনকে সুপারিশ করেছেন, যেখানে প্রতিবন্ধী থাকার কথা ২১ জন। কিন্তু মাত্র তিনজনকে সুপারিশ করে বাকি প্রতিবন্ধীদের নন ক্যাডারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 চতুর্থত, এই বিসিএসে ৪০৪টি পদ শূণ্য রাখা হয়েছে। কমিশন বলেছে, এটা নাকি মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সংরক্ষিত পদ। অথচ ৩১ ও ৩৩তম বিসিএসে কোটার পদ মেধা থেকে পূরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদেরকেও কৌশলে বাঞ্চিত করা হয়েছে। বঞ্চিতরা প্রধানমন্ত্রী, জনপ্রশাসন মন্ত্রালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, পিএসসির চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপি দিয়েও কোনও সাড়া শব্দ পায়নি; তাদের হাহাকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কান পর্যন্ত পৌঁছায়নি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা তাদের বাবাদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য সারাদিন প্রখর রোদের মধ্যে গেটে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনও লাভ হয়নি।
পঞ্চম, প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ আছে, গণিতে শূণ্য পদের সংখ্যা ৪৭। ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণের নিয়ম রয়েছে। ৩০ শতাংশ = ১৪ জন। যদি এখানে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় একজনকেও খুঁজে না পাওয়া যায় তবে বাকি ৭০ শতাংশ = ৩৩ জনকে কমিশনের সুপারিশ করার কথা, অথচ হাস্যকর সংবাদ হলো- কমিশন এখানে সুপারিশ করেছে মাত্র ২৫ জনকে। বাকি ৮টি পদ কার জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে? অন্যদিকে টেকনিক্যাল ক্যাডারে স্বাস্থ্য সহকারী পদে ৭৪টি পদ খালি রাখা হয়েছে। বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে ১ হাজার ৬১টি পদের মধ্যে ৫০৭ টি পদ শূণ্য। সারা দেশের তথ্য তো আরও ভয়াবহ। স্বাস্থ্য ক্যাডারে পদ শূণ্য রাখার জন্য স্বাস্থমন্ত্রীও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
ষষ্ঠত, ৩৪তম বিসিএস ফলাফল প্রকাশ পায় প্রজ্ঞাপনের প্রায় ৩ বছরের মাথায়। প্রশাসন ক্যাডারে শূণ্য পদ ছিল ২০০ কিন্তু সুপারিশ করা হয়েছে ২৯৩ জনকে। ৩ বছরে ৯৩টি পদ খালি হতেই পারে। কিন্তু টেকনিক্যাল বা প্রফেশনাল ক্যাডারে একটা পদ ও বাড়েনি। উল্টো খালি রাখা হয়েছে। এ থেকে মোটামুটি বলা যায়, ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ। ৩৪তম বিসিএসে আরও একটা রেকর্ড তৈরি হয়েছে, ফলাফল প্রকাশ করা হয় ছুটির দিন রাত ১০টায়। ইতোপূর্বে আর কোনও বিসিএসের ফলাফল ছুটির দিনে প্রকাশ হয়নি। এক্ষেত্রে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, “ছুটির দিনে রাতের আঁধারে তাদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে পিএসসি এবং তাদের বঞ্চিত করেছে”।
 বাংলা ট্রিবিউন: জেনেছি আপনারা হাইকোর্টে রিট করেছেন?

নূর ইসলাম নূর:
এ পর্যন্ত হাইকোর্টে প্রায় ১২ থেকে ১৩টি বিভিন্ন গ্রাউন্ডে রিট করেছেন আন্দোলনকারীরা। ২৮ থেকে ৩৩তম বিসিএস পর্যন্ত কোনও রিট হয়নি, এ ধরনের আন্দোলনও হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে ৩৪তম বিসিএসে এত রিট বা আন্দোলন কেন? কিন্তু এ বিষয়ে কেউ ক্ষতিয়ে দেখছেন না। কারণ সব দুর্নীতি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে রয়েছে। এছাড়া ৩৪তম বিসিএসের দুর্নীতির সংবাদ গণমাধ্যমে যেভাবে প্রকাশ হয়েছে তা তদন্ত করলে এটার ভেতরের খবর সব বের হয়ে আসবে। তাই সরকার চায় না এটা তদন্ত করতে। সব ফাঁস হয়ে গেলে সরকারের জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবে।

বাংলা ট্রিবিউন: আন্দোলনরত অনেকেকেই পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। কোনও রকম নির্যাতন করেছে কি?

নূর ইসলাম নূর:
কোনও নির্যাতন করেনি। তবে আমাদের শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করতেও দেয়নি। দেড় মাস ধরে আন্দোলন করছি অথচ রাস্তায় গাড়ি আটকাইনি, ভাংচুর হয়নি। আমাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ। শরীরের রক্ত রাস্তায় ঢেলেছি। শরীরে ও অরিজিনাল সার্টিফিকেটে আগুনও দিয়েছি। বর্তমানে আমি খুবই অসুস্থ। আমাদের আন্দোলনকারী অনেকেই অসুস্থ। আন্দোলনে বারবার বলেছি, আমাদের কাছে দুর্নীতির প্রমাণ আছে। একটু আমাদের কথা শোনেন, তারপরও কারও কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। সবাই যেন দুর্নীতেকেই প্রশ্রয় দিচ্ছে। এভাবে মেধাবীদের বঞ্চিত করলে, রিজিকের ওপর আঘাত হানলে, হয়তো এরাই একদিন বিপ্লবী হয়ে উঠবে, তখন বিদ্রোহের আগুন নেভানোর মত পর্যাপ্ত রসদ পাওয়া যাবে না। শিক্ষামন্ত্রীকে প্রায় বলতে শুনি, মেধাবীদের পৃষ্ঠপোষকতা দেবে সরকার। কিন্তু কই? আমরা দেখছি মেধাবীরাই সব চেয়ে অবহেলিত। মেধাবীদের বঞ্চিত করে ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা কি আদৌ গড়া সম্ভব?
বাংলা ট্রিবিউন: সামনে কোনও কর্মসূচি দেবেন কি?
নূর ইসলাম নূর: অবশ্যই, আমরা এখনও আন্দোলনের মধ্যে আছি। বিসিএস নামক সোনার হরিণের পেছনে তিন বছর পার করে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পাস করার পরেও প্রার্থীরা বলেন, তৃতীয় বা চতুর্থ শ্রেণীর চাকরি দিলেও খুশি। কারণ একটাই, তার চাকরির বয়স শেষ। আমরা তো এখন রিকশা চালাতেও পারবো না। হতাশা ও হাহাকার দেখে চোঁখের পানি ধরে রাখতে পারি না। অথচ প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রায় ৫০ হাজার পদ খালি, কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এখনও চুপ। অবিচার ও বঞ্চিত করার জন্য আমাদের মধ্যে যে হতাশা বিরাজ করছে, কেউ যদি আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় তবে তার দায়ভার কি পিএসসি নেবে?

No comments:

Post a Comment